দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কোটা সংস্কার আন্দোলন ও জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছিল সবচেয়ে সহিংস ও রক্তাক্ত দিনগুলোর একটি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। একই দিন রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন সরকার। এ সময় দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবাও কার্যত বন্ধ ছিল।
১৮ জুলাইয়ের সহিংসতার পর ১৯ জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রামপুরা, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, উত্তরা, মহাখালী, পল্টন ও প্রেসক্লাব এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার বাইরে খুলনা, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রংপুর, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও গাজীপুরেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ ও আহতদের নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভিড় বাড়ে। অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করেও আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ জুলাই অন্তত ৫৬ জন নিহত হন। আর ১৭ থেকে ১৯ জুলাই—এই তিন দিনে প্রাণ হারান ১০৩ জন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয় এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে আটকের ঘটনাও ঘটে।
দিনটিতে বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রাজধানীর রামপুরা থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি, মিরপুর ও বনানীতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়, মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মেট্রোরেলের কাজীপাড়া স্টেশনেও ভাঙচুরের পর কর্তৃপক্ষ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে দূরপাল্লার বাস ও ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং ঢাকার সঙ্গে দেশের যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও বাতিল করা হয়।
নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলার ঘটনাও দিনটির অন্যতম আলোচিত ঘটনা। হামলাকারীরা কারাগারের গেট ভেঙে বন্দিদের বের করে নিয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় ৮২৬ জন কয়েদি পালিয়ে যান এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটের ঘটনাও ঘটে। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে জঙ্গি সংগঠনের কয়েকজন সদস্যও ছিলেন।

এদিকে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। তবে র্যাব এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, তাদের হেলিকপ্টার থেকে কোনো গুলি ছোড়া হয়নি; আকাশ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও দিনটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় তৎকালীন সরকারের তিন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আন্দোলনকারীরা প্রথমে ৮ দফা এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা ও দুই মন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবি উপস্থাপন করেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আন্দোলনের পেছনে বিএনপি-জামায়াতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আন্দোলনের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সময়ে ‘সন্তানের পাশে অভিভাবক’ ব্যানারে রাজধানীর শাহবাগে মানববন্ধন করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানান অভিভাবকেরা।
১৯ জুলাইয়ের ঘটনাবলি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। কারফিউ, সেনা মোতায়েন, দেশব্যাপী সহিংসতা, প্রাণহানি, যোগাযোগব্যবস্থার বিপর্যয় এবং আন্দোলনের নতুন রাজনৈতিক দাবির উত্থান—সব মিলিয়ে দিনটি জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
এমএম/